২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যে এগুচ্ছে সরকার ইবিতে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা
অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা
**********
অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারাকে টেকসই করার লক্ষ্যে সরকার পাঁচ বছর মেয়াদি একটি কৌশলগত কাঠামো গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, এ কৌশলের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হচ্ছে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করা। তিনি বলেন, অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাকে এ কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। শনিবার (৩ অক্টোবর) সকালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান মিলনায়তনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘শিক্ষা-শিল্পের ঐকতান, কর্মসংস্থানের সমাধান’ শীর্ষক ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিক কোলাবোরেশন প্রোগ্রামে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একটি নতুন ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হলে শুধু প্রবৃদ্ধির পরিমাণ বাড়ালেই হবে না; উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। এ লক্ষ্যেই সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও জনগণের ম্যান্ডেটকে একটি সুনির্দিষ্ট পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামোয় রূপ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার ও জনগণের ম্যান্ডেটকে একটি সুনির্দিষ্ট পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত কাঠামোর (Five-Year Strategic Framework) রূপ দেওয়া হয়েছে। এতে যেমন রয়েছে ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের দার্শনিক ভিত্তি, তেমনি রয়েছে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা। পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণ ও টেকসই সমৃদ্ধির যাত্রায় সরকার ‘৩আর’ (3R) কৌশল গ্রহণ করেছে। কৌশলের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) ডলারের একটি সমৃদ্ধ অর্থনীতি হিসেবে গড়ে তোলা।”
অর্থনীতি পুনর্গঠনে ৩আর কৌশল
সরকারের গৃহীত ‘3-r’ কৌশল ব্যাখ্যা করে অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, প্রথম ‘আর’—রিকভার (Recover)—এর লক্ষ্য হচ্ছে ভঙ্গুর অবস্থায় থাকা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং অর্থনীতিকে স্বাভাবিক গতিতে ফিরিয়ে আনা। দ্বিতীয় ‘আর’—রেস্টোরেশন (Restoration)—এর আওতায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং অর্থনীতির ভিত্তিকে আরও সুদৃঢ় করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আর তৃতীয় ‘আর’—রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাক্সিলারেটর (Reconstruction for Accelerator)—এর মাধ্যমে দ্রুততার সঙ্গে পুনর্গঠন কার্যক্রম সম্পন্ন করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
কর্মসংস্থান ও বৈষম্য হ্রাসে গুরুত্ব/
অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও বৈষম্যহীন কল্যাণরাষ্ট্র গঠনে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং মানুষের জীবনমানের উন্নয়নকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার সঙ্গে পর্যাপ্ত ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী সেই প্রবৃদ্ধির অংশীদার হতে পারবে। শিক্ষিত যুবসমাজের বেকারত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাধারণ ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়ন (Skill Development), নাগরিকত্ববোধ এবং উদ্ভাবনী সক্ষমতা (Innovation) বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং দক্ষ মানবসম্পদ, গবেষণা, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা তৈরির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন। নতুন উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপ তৈরির ক্ষেত্রে সরকারের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ খাতে ৫০ মিলিয়ন ডলারের একটি বিশেষ তহবিল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে তরুণ উদ্যোক্তাদের নতুন উদ্যোগ গ্রহণ, উদ্ভাবনী ধারণা বাস্তবায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ সম্প্রসারিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সংযোগে নতুন সম্ভাবনা
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে কর্মমুখী ও ভবিষ্যতের শ্রমবাজারের উপযোগী করে গড়ে তুলতে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তোলা জরুরি। একাডেমিক জ্ঞান ও শিল্পক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি হলে শিক্ষার্থীরা যেমন কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারবেন, তেমনি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ পাবে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপ-উপাচার্য ড. এমতাজ হোসেন এবং ট্রেজারার ড. ইদ্রিস আলী। অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন খাতের শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৭ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। এর মধ্যে ছিলেন প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড, আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ, আবুল খায়ের গ্রুপ, বেটোপিয়া গ্রুপ, টেলিটক, ইনোফিক্স আইটি সলিউশনস লিমিটেড, বেনকিউ, টেকনোডেরা, টিপি-লিংক বাংলাদেশ, সিঙ্গার, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো, রাজবাড়ী জুট মিলস লিমিটেড, গ্রামীণফোন, আকিজ রিসোর্স, মেটাডোর ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেড, বিকাশ, বিআরবি কুষ্টিয়া, ডিবিসি নিউজ, গোল্ডেন জুট এবং ব্র্যাক-এর প্রতিনিধিরা। শিক্ষা ও শিল্পের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা জোরদারের এমন উদ্যোগকে উচ্চশিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থান ও শিল্পের প্রয়োজনের সমন্বয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি, কর্মবাজারের পরিবর্তিত চাহিদা এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের বাস্তবতায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠ্যক্রম, দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবনের সঙ্গে শিল্প খাতের প্রত্যক্ষ সংযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দিন দিন গুরুত্ব পাচ্ছে।
******
তথ্য প্রকাশনা ও জনসংযোগ অফিস